অনির্ণেয় ও অসংজ্ঞায়িত কি জমজ ভাই?

Md. Abrarul Hoque Saad

অনির্ণেয় ও অসংজ্ঞায়িত কি জমজ ভাই?

“অনির্ণেয়” এবং “অসংজ্ঞায়িত”  শব্দ দু’টি শুনতে প্রায় একইরকম মনে হলেও এই শব্দ দুইটির অর্থ কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছোট্ট দুইটি শব্দ, কিন্তু এই দুইটি শব্দ নিয়েই রয়েছে বহু তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা-সমালোচনা। তার কিছুটা নিয়েই আজকের বিশ্লেষণ। তোমাদের সুবিধার জন্য আজ আমরা আমাদের এই বিশ্লেষণকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করবো।
                                        

                                                               প্রথমেই শব্দ নিয়ে গুঁতোগুঁতি!

বিজ্ঞান ও গনিতের রাজ্যে কোন বিষয়ের ডেফিনেশন বা সংজ্ঞা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই যা করতে হয় তাহলো, ঐ বিষয়ের শিরোনাম নিয়ে অর্থাৎ শব্দটি নিয়ে একটু গুঁতোগুঁতি করা। আমরাও সেই পথেই অগ্রসর হব। প্রথমে “অনির্ণেয়” শব্দটির দিকে একটু লক্ষ্য করো। এই শব্দটিকে কী করা যেতে পারে? আচ্ছা, আমরা যদি শব্দটিকে দুই ভাগ করে ফেলি? তাহলে কি কিছু বুঝতে পারবো? চলো করে দেখি! “অনির্ণেয়”- শব্দটিকে আমরা লিখতে পারি, “অ-নির্ণেয়” বা ইংরেজিতে বললে, “Indeterminate” থেকে “In-Determinate”। আমরা কি কিছু বুঝতে পারছি? নির্ণেয় শব্দ বলতে আমরা বুঝি “যা নির্ণয় করা যায়”। এর শুরুতে বিপরীতসূচক  “অ” বসিয়ে হয়েছে, “অনির্ণেয়”।  এর পুরো অর্থ দাঁড়ায়- “যা নির্ণয় করা যায় না!”।  অর্থাৎ, এখন আমরা বলতে পারি, “অনির্ণেয়”  শব্দ দ্বারা বোঝায়, “যার নির্দিষ্ট কোনো মান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়”। এবার চলো “অসংজ্ঞায়িত” শব্দটি নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করি। পূর্বের মতো দুইভাগ করলে হয়, “অ-সংজ্ঞায়িত” বা ইংরেজিতে “Un-Defined”। “সংজ্ঞায়িত” শব্দের অর্থ হলো “যার মূলত অস্তিত্ব রয়েছে” বা “যার সংজ্ঞা রয়েছে” অথবা “যা যুক্তিগত ভাবে বাস্তব”। এর শুরুতে বিপরীতসূচক “অ” থাকার কারণে এর অর্থ হয়- “যার অস্তিত্ব নেই” বা “যার সংজ্ঞা নেই” অথবা “যা যুক্তিগত ভাবে সম্ভব না”।  


                                                                      উদাহরণের মারপ্যাঁচ

প্রথম ধাপে আমরা শব্দ নিয়ে গবেষণা করে “অনির্ণেয়” এবং “অসংজ্ঞায়িত” শব্দ দু’টি নিয়ে সূক্ষ্ণ একটি ধারণা পেয়েছি। এখন আমরা দু’টি উদাহরণ দেখবো। কেননা গণিত বা বিজ্ঞানের কোনো বিষয় ভালোভাবে বুঝতে হলে উদাহরণের বিকল্প নেই।

তোমরা হয়তো এই প্রব্লেমটার সাথে প্রায় সকলেই পরিচিত.
                                                                                1/0 = ?
                         
এই প্রব্লেমটির উত্তর কত হতে পারে? যা-ই হোক না কেনো, আগে নিজেরা একটু চেষ্টা করে দেখো। তারপর আবার পড়া শুরু করবে। তোমার উত্তর সঠিক হলে “কনগ্রেটস!” (না পারলেও কোনো সমস্যা নেই! তুমি যে চেষ্টা করেছো, তার জন্য তোমাকেও অভিনন্দন!”
তো চলো, আমরা আমাদের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি…



প্রথমেই আমরা ধরে নেই যে, এই সমস্যাটির একটি সমাধান রয়েছে। ধরি, সমাধানটি হলো p,

এখন আমরা লিখতে পারি,
    1 / 0 = p 
বা, 1 = 0 x p
এখন একটি মজার বিষয় লক্ষ্য করো। p এর এমন কোনো মান আছে কি? যার জন্য এই সমীকরণটি সিদ্ধ হয়? উত্তর হলো, “না”! অথচ আমরা আগেই ধরে নিয়েছিলাম যে, p আমাদের উক্ত সমীকরণের একটি সমাধান। কিন্তু আমরা এমন কোনো p- ই পাচ্ছি না, যার জন্য এই সমীকরণটি সিদ্ধ হয়। অর্থাৎ আমাদের এই সমস্যার কোনো সমাধানও নেই। একেই আমরা বলি, “অসংজ্ঞায়িত”। অর্থাৎ, যার কোন সংজ্ঞা নেই, সমাধান নেই। এর কারণেই বলা হয়, ০ দিয়ে কোন কিছুকে ভাগ করলে ভাগফল বের করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ “অসংজ্ঞায়িত”।

এবার আরেকটি  প্রবলেম। (আবারো বলছি, আগে নিজে নিজে চেষ্টা করে দেখবে।)

                                                                               0 ÷ 0 = ?

এই প্রশ্ন দেখে হয়তো বা অনেকেই বলে দিবে যে, এর উত্তর হচ্ছে ১। কিন্তু না! এর উত্তরেও রয়েছে মজার একটি ব্যখ্যা!

পূর্বের মতো ধরে নেই আমাদের উত্তর হচ্ছে  p। তাহলে লেখা যায়,
     0 ÷ 0 = p
বা, 0 = p x 0
এখন একটু লক্ষ্য করো। আমাদের বামপক্ষ ০। তাহলে ডানপক্ষে p এর মান কত হলে তা ০ হবে? আমরা জানি যে, ০ এর সাথে কোন কিছু গুণ করলে গুণফল শূন্যই হয়। তাহলে আমরা বলতে পারি, এখানে p এর অসীম সংখ্যক মান রয়েছে! অর্থাৎ, আমাদের সমাধান সংখ্যাও “অসীম”! একেই আমরা বলি “অনির্ণেয়”। অর্থাৎ, যখন কোনো একটি সমস্যার অসীম সংখ্যক সমাধান থাকে এবং নির্দিষ্ট করে একটি মান নির্ণয় করা সম্ভব হয় না, তখন তাকে “অনির্ণেয়” বলা হয়।

                                                                      রহস্য উদঘাটনে সমস্যা!

(উত্তর দেখার পূর্বে নিজে থেকে চেষ্টা করে আমাদের জানিয়ে দিতে পারো!)
1] Infinite + Infinite = ?
– এটি কি “অনির্ণেয়” নাকি “অসংজ্ঞায়িত”?  আচ্ছা ধরো, তোমাকে পূর্বের 0/0 এবং 0/0 এর যোগফল বের করতে বলা হলো। তুমি কী বলবে?  উত্তর অসীম? কিন্তু না। আসলে এই সমস্যার উত্তর হচ্ছে সসীম একটি মান। তুমি যখন দুইটি সংখ্যা কে যোগ করে দিচ্ছো, তখন যোগফলটি সসীম হয়ে যাচ্ছে এবং এর মান পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এর যোগফল বা সমাধান এর সংখ্যা অসীম।  এর মানে হলো, এর অসীম সংখ্যক সমাধান রয়েছে। আবার মান পাওয়ার কারণে একদম শুরুতেই বলা যায় যে, এটি অসংজ্ঞায়িত হবে না। তাহলে কি এটি অনির্ণেয়? উত্তর হচ্ছে “হ্যাঁ”। কিন্তু কেনো?  আচ্ছা বলো তো, ইনফিনিটি (অসীম) কি শুধু এক প্রকারই? একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে যে, পৃথিবীতে অসীম (বহু) সংখ্যক ইনফিনিটি রয়েছে। এর কারণে তুমি যখন দুটি ইনফিনিটি যোগ করছো, তখন তুমি আসলে অনেক সংখ্যক ইনফিনিটি এর মধ্য থেকে দুটি ইনফিনিটি নিয়ে এসে যোগ করে দিচ্ছো। যার মান তুমি নির্দিষ্ট করে বলতে পারবে না।
তাই তুমি যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাও, তাহলে তোমাকে বলতে হবে-

                                                             Infinite + Infinite = Infinite

আর ইনফিনিটি যেহেতু “অনির্ণেয়” অর্থাৎ এর মান বের করা সম্ভব নয়। তাই Infinite + Infinite এর মানও অনির্ণেয় হবে।

আশা করি, বাকিগুলো এখন নিজেরাই পারবে।

2] Infinite – Infinite = ?
3] Infinite x Infinite = ?
4] Infinite / Infinite = ?

                                                                         এভারেস্ট জয়!!!!!!

এতক্ষন তো অনেক বকবক করা হলো। কিন্তু এর আরও বহু আলোচনা রয়েছে যা একটু কষ্ট করে গুগল মামা কে জিজ্ঞেস করলেই পেয়ে যাবে! তাহলে আমাদের পুরো বিশ্লেষণকে সামারাইজ করলে কী দাঁড়ায়? যখন একটি বিষয়ের কোন মান বা সমাধান পাওয়া যায় না, তখন তাকে আমরা বলবো “অসংজ্ঞায়িত”।  আর যখন কোনো একটি বিষয়ের মান বা সমাধান থাকে, কিন্তু তা অসীম সংখ্যক হওয়ায় নির্দিষ্ট ভাবে নির্ণয় করা যায় না, তখন তাকে আমরা বলবো “অনির্ণেয়”।
                               

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *